1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. armanchow2016@gmail.com : bbn news : bbn news
মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১০:৫৮ অপরাহ্ন

করোনার আঁচড় লাগেনি সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও দরিয়ানগর গ্রামে: কারণ নিয়ে কী বলছেন বিজ্ঞানীরা?

সাংবাদিক :
  • আপডেট : সোমবার, ১৭ মে, ২০২১
  • ৯০ সংবাদ দেখেছেন

আহমদ গিয়াস: কক্সবাজারের সর্বদক্ষিণ প্রান্তের একটি ছোট্ট দ্বীপ সেন্টমার্টিন বা নারিকেল জিঞ্জিরা, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে প্রবাল জন্ম বলে আমরা দ্বীপটিকে প্রবাল দ্বীপ বলেও জানি; যে দ্বীপে করোনার আঁচ লাগেনি গত ১৪ মাসেও! শুধু তাই নয়, করোনা সংক্রমণের শীর্ষে থাকা কক্সবাজার শহরের লাগোয়া একটি গ্রাম হয়েও শহরতলীর সমুদ্র তীরবর্তী পাহাড়ী গ্রাম দরিয়ানগরেও এখনও করোনার আচড় লাগেনি।
গত বছর মার্চে কক্সবাজারে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ইতোমধ্যে কক্সবাজার জেলায় করোনা রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ছাড়িয়েছে। আর মারা গেছে শতাধিক করোনা রোগী। জেলায় করোনা সংক্রমণের শীর্ষে আছে কক্সবাজার সদর উপজেলা। জেলার অর্ধেক করোনা রোগীই সদর উপজেলার। কিন্তু এই সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের একাংশ নিয়ে গঠিত একটি ছোট্ট গ্রাম দরিয়ানগরে গত ১৪ মাসেও ধরা পড়েনি কোন করোনা রোগী।
করোনা সংক্রমণে কক্সবাজার জেলার তৃতীয় স্থানে রয়েছে টেকনাফ উপজেলা। এ উপজেলারই একটি ছোট্ট ইউনিয়ন সেন্টমার্টিন দ্বীপ। মূল ভ‚-খন্ড থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ দ্বীপে বাস করে প্রায় ৮ হাজার মানুষ। অথচ এ দ্বীপে করোনার ছোবল পড়েনি এখনও।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সেন্টমার্টিন ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ রোববার বলেন, আমরা দ্বীপবাসী করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে সচেতন। এবিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রচারণাও চালানো হয়। ফলে এখনও পর্যন্ত সেন্টমার্টিনের কোন বাসিন্দার শরীরে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েনি।
টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক ও উপজেলা করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ডা. টিটু চন্দ্র শীল সেন্টমার্টিনে এখনও করোনা সংক্রমণ না হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেন।
শহরের কলাতলী মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে আড়াই কিলোমিটার পথ গেলেই একটি ব্রীজ; এই ব্রীজটির এপারে পৌরসভা, ওপারে ঝিলংজা ইউনিয়নের একটি ছোট্ট গ্রাম দরিয়ানগর। যেখানে বাস করে প্রায় ৩ হাজার মানুষ। বড়ছড়া নামের একটি পাহাড়ী খালের পাশে গড়ে ওঠা এ জনপদে গত ১৪ মাসেও কোন করোনা রোগী ধরা পড়েনি বলে জানান কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান টিপু সোলতান।
তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নে গত ১৪ মাসে শতাধিক করোনারোগী ধরা পড়েছে। মারা গেছেন ৩/৪ জন। কিন্তু দরিয়ানগর বড়ছড়ার বাসিন্দাদের কারো শরীরে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ার খবর পাওয়া যায়নি। হয়ত: সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা হওয়ায় লবণাক্ত হাওয়ার কারণে দরিয়ানগর গ্রামে করোনা সংক্রমণ হচ্ছে না।
স্থানীয় বড়ছড়া আশ্রয়ণ সমিতির সভাপতি মাহবুব আলম বলেন, এখানকার মানুষ করোনার আগে যেভাবে চলাচল করত, এখনও সেভাবেই চলাচল করছে। মাস্ক ছাড়াই নিয়মিত মসজিদে গিয়ে নামাজও আদায় করছে। হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ মাস্কও পরেনা। ভিন্ন এলাকার বহু লোকও এই গ্রামে আসে। তবু এই গ্রামের কেউ করোনা আক্রান্ত হয়নি, এটা আল্লাহর রহমত। এতে প্রমাণিত হয়, করোনা কারো স্পর্শে ছড়ায় না।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাক আহমদ বলেন, এ গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে। সর্দি কাঁশি-জ¦রের মতো স্বাভাবিক অসুখে ডাক্তারের কাছে যায় না। তারা স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসকের ওষুধ খায় আর লবণযুক্ত গরম পানি দিয়ে বার বার গলা ও নাক পরিস্কার করে। এতে সর্দি-কাঁশি দুই-তিনদিনেই সেরে যায়।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন দরিয়ানগর গ্রীণ ভয়েস সভাপতি পারভেজ মোশাররফ বলেন, হয়ত: কেউ টেস্ট করেনি বলে করোনা ধরা পড়েনি।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, কক্সবাজারে প্রথম করোনা রোগী ধরা পড়ে গত বছরের ২৪ মার্চ চকরিয়ার খুটাখালী গ্রামে, আর মারা যায় ওই বছরের ২৮ এপ্রিল রামুর কাউয়ারখোপ গ্রামে। কিন্তু সেন্টমার্টিন ও দরিয়ানগরে করোনা সংক্রমণের কোন খবর পাওয়া যায়নি।
সেন্টমার্টিন ও দরিয়ানগরে করোনা সংক্রমণ না হওয়ার বিষয়টি ‘অত্যন্ত আনন্দদায়ক’ অভিহিত করে তিনি বলেন, তবে কী কারণে সেকারণে করোনা সংক্রমণ হচ্ছে না তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন।
জানতে চাইলে কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. অনুপম বড়ুয়া বলেন, হয়ত: খোলামেলা পরিবেশ থাকার কারণে দরিয়ানগর গ্রামে করোনা সংক্রমণ হতে পারছে না। এমনিতে গ্রামে করোনা কম ছড়ায়, শহরে বেশি ছড়ায়। যেহেতু বেশি মানুষ একত্রিত হয় শহরে।
কক্সবাজারে প্রায় এক হাজার গ্রাম রয়েছে। কিন্তু কেবল দুটি গ্রামে কেন করোনার ছোবল পড়েনি জানতে চাইলে বিশিষ্ট সমুদ্র বিজ্ঞানী ড. ম কবীর আহমদ বলেন, করোনা মানুষের মাধ্যমে মানুষে ছড়ায়। মানুষের শরীরে বড় হয়। কিন্তু যেখানে মানুষের ঘনত্ব কম বা খোলামেলা পরিবেশ আছে, সেখানে করোনা সংক্রমণ কম হওয়া স্বাভাবিক। তবে শহর লাগোয়া গ্রাম হয়েও দরিয়ানগরে কিংবা জলবিচ্ছিন্ন সেন্টমার্টিন দ্বীপে করোনা সংক্রমণ না হওয়ার পেছনে পরিবেশের ভারসাম্যগত কোন কারণ থাকতে পারে।
তিনি বলেন, ভাইরাস হল কল্পনাতীত ক্ষুদ্র এক জৈব কনা, যা খালি চোখে দেখা যায় না। আমাদের আঙুলের ডগায় অনায়াসে শতকোটি ভাইরাস জায়গা করে নিতে পারে। এই ভাইরাসের প্রাচুর্যে মানব জাতি এখন দিশেহারা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা এখনও ভাইরাসের মহাসমুদ্রের সৈকতেই অবস্থান করছেন। বিজ্ঞানীরা এখনও পর্যন্ত মাত্র কয়েক হাজার ভাইরাস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পেরেছেন। পরিবেশে ভাইরাসের প্রকারভেদ এতই বেশি যে, এই সংখ্যা নেহায়েতই তুচ্ছ। পৃথিবীতে আছে কোটি কোটি প্রজাতির ভাইরাস। কেবল সাগর মহাসাগরগুলোতে আছে অন্তত ১ কোটি প্রজাতির ভাইরাস। তবে সকল ভাইরাস জীবদেহে আক্রমণ করেনা। বরং কিছু সামুদ্রিক প্রাণী ভাইরাস শিকার করে বেড়ায়।
ভাইরাস গবেষক ড. কবীর বলেন, এ পর্যন্ত হওয়া গবেষণা অনুযায়ী সমুদ্রের শীর্ষ ভাইরাস শিকারী প্রাণী হল স্পঞ্জ, দ্বিতীয় কাঁকড়া এবং তৃতীয় ঝিনুক। স্পঞ্জ মাত্র ৩ ঘন্টায় ৯৪ শতাংশ ভাইরাস দূর থেকে সক্ষম, আর ২৪ ঘন্টায় ৯৮ শতাংশ। তবে কাঁকড়া ২৪ ঘন্টায় ৯০ শতাংশ এবং ঝিনুক ১২ শতাংশ ভাইরাস দূর থেকে সক্ষম।
তিনি বলেন, সাগরের বাস্ততন্ত্র বা ইকোসিস্টেম অনেক জটিল। এখানে একটি বিশাল প্রাণীগোষ্ঠী ভাইরাসের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলে এবং সাগরের বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ ঠিক রাখে। একইভাবে ভ‚-ভাগের পরিবেশেও ভাইরাস ও ভাইরাস শিকারী অনেক প্রাণীকুল রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর পরিবেশে তাদের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বিঘিœত হওয়ায় একটি ভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করেছে।
দরিয়ানগর ও সেন্টমার্টিনসহ কক্সবাজারের সমুদ্র উপকুলীয় এলাকায় স্বাভাবিক বায়ুচাপ থাকায় এবং এর ফলে বাতাসের কলামে অক্সিজেনের মাত্রা যথাযথ থাকায় এসব এলাকায় করোনার প্রকোপ কম হচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া।
তিনি বলেন, বড় বড় দালান ও বায়ু দূষণের কারণে দেশের বিভিন্ন শহরে বায়ুচাপ কম থাকে। যেখানে বাতাসের কলামে অক্সিজেন-নাইট্রোজেনসহ অন্যান্য উপাদান থাকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। হয়ত: এমন পরিবেশই করোনা ভাইরাস বিস্তারের জন্য উপযুক্ত।

শেয়ার করুন

একই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2021,বিবিএন নিউজ
Developer By Zorex Zira