1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. armanchow2016@gmail.com : bbn news : bbn news
মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৯:৪৬ অপরাহ্ন

পেকুয়ায় শিক্ষা এখন পুরোপুরি কোচিং নির্ভর !

সাংবাদিক :
  • আপডেট : সোমবার, ৮ নভেম্বর, ২০২১
  • ৮৯ সংবাদ দেখেছেন

আমিরুল ইসলাম রাশেদ, পেকুয়া (কক্সবাজার) থেকেঃ

পেকুয়া উপজেলায় শিক্ষার নামে চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য।ফলে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে, শিক্ষক নামের এই অসাধু ব্যবসায়ীদের নিকট।শিক্ষা যেভাবে লাভজনক পণ্য হয়ে উঠেছে তাতে মনে হয় আর এক দশকও অপেক্ষা করতে হবে না। কয়েক বছরেই এটা শুধু কেনাবেচার সামগ্রী হবে। শিক্ষা থেকে শেখা বিষয়টি পুরোপুরি উধাও হয়ে যাবে। যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠন করার কথা তাদের চরিত্র এখন বিচিত্র। তাদের মধ্যে কিছু নামধারী অর্থলোভী শিক্ষক সরকারী নিয়ম-নীতিমালা লঙ্ঘন করছেন না। এদের কারণে প্রকৃত শিক্ষকরা তাদের সামাজিক মর্যাদা হারিয়েছেন। এসব শিক্ষকদের মনোযোগ এখন আর শিক্ষাদানের দিকে নয়, স্বচ্ছল অভিভাবকের সন্তানদের প্রাইভেট কোচিং পড়ানোর দিকে তাদের দৃষ্টি।

বাবা-মা তাদের সন্তানদের পড়ালেখা শিখার জন্য স্কুলে পাঠান। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠে আগ্রহী ও মনোযোগী করে তোলার দায়দায়িত্ব শিক্ষকদের। কিন্তু, চিত্রটা এখন বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থলোভী শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ভাল করে না পড়িয়ে দায়সারা ক্লাস নিয়ে প্রতারণা করছেন।  ঠকাচ্ছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের। প্রাইভেট কোচিং এর কুপ্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষা গ্রহণের বদলে সহ্য করতে হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। নৈতিকতা ভুলে গিয়ে এসব শিক্ষক বৈষম্য-নৈরাজ্য করছেন অস্বচ্ছল, সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে। যে সব শিক্ষার্থী প্রাইভেট কোচিং করে তাদের প্রতি এসব শিক্ষকদের এক ধরণের আচরণ এবং আদুরে আদুরে ব্যবহার।

অন্যদিকে, যে সব শিক্ষার্থী স্কুলের কোন শিক্ষকের নিকট প্রাইভেট কোচিং করে না ওই সব বাচ্চার প্রতি শিক্ষকদের অমনোযোগিতা, তাদের এড়িয়ে চলা এবং অস্বাভাবিক আচরণ করা হয়। এখন স্কুলে পড়া-লেখা শিখতে নয়, কোন বইতে কি পড়া দেয়া হয় তা আনতেই স্কুলে যায় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা স্কুলে দায়সারা ক্লাস করান বলেই এমন চিত্র। ওই সব দায়সারা ক্লাসে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বাড়তি থেকে শিখে আসার জন্য হোমওয়ার্ক দিয়ে পর দিন সেই হোমওয়ার্ক শিখে এসেছে কিনা তার মহড়া চলে। যে সব শিক্ষার্থীর বাড়িতে কোন প্রাইভেট কোচিং কিংবা গৃহশিক্ষকের ব্যবস্থা নেই, বাড়ি থেকে পড়া না শিখে আসার দায়ে তাদের শাস্তি  প্রদানের কায়দাও পৈশাচিক। শিশুদের শারীরিক নির্যাতন করেন এসব অর্থলোভী শিক্ষক-শিক্ষিকা।যদি ও  সরকার ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক মারধর করা সম্পূর্ণ নিষেধ করেছে।

এদিকে যারা বাড়ি থেকে পড়া শিখে যায় না, তাদেরকে মেরে হাত ফুলিয়ে দেয়া হয়। কোন শিক্ষার্থীর রেজাল্ট তুলনামূলক খারাপ হলে অভিভাবকের তদারকির প্রেক্ষিতে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকা জবাব দেন, বাড়ির গৃহশিক্ষক কি পড়াশোনা করান না। যিনি শিক্ষা দেবার কথা তার মুখে এ রকম কথা শোনে হতভম্ব হন অভিভাবকরা। ওই প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক তাদের স্কুল টাইম শেষে স্কুলেই স্বচ্ছল অভিভাবকগণের বাচ্চাদের প্রাইভেট কোচিং পড়াতে ব্যস্ত হন। শুধু স্কুলে নয়, নীতিমালা লঙ্ঘন করে স্কুলের বাইরে নিজ স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট কোচিং চলে। অভিভাবকরা এসবের প্রতিবাদ করেন না, প্রতিবাদ করলে তাদের বাচ্চাদের ভুক্তভোগী হতে হয়।পরীক্ষার রেজাল্টে নামে ধস। বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কেজি স্কুল ও একাডেমি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অনিয়ম দুর্নীতির জন্য তাদের বিরুদ্ধে প্রথমে নজরদারী ও ব্যবস্থা নেয়ার কথা স্কুল ম্যানেজিং কমিটির। কিন্তু, ওই সব ম্যানেজিং কমিটি চোখ থাকতে অন্ধ-এর ন্যায় আচরণও অবাক করার মতো। এদের নীরব ভূমিকা রহস্যজনক অভিভাবকদের কাছে।

জানা গেছে, উপজেলায় পেকুয়া মডেল জি এম সি ইনস্টিটিউট , প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজগুলোর শিক্ষকদের ঠিক এরকমই চিত্র কেউ। দিবালোকে স্কুল,কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে  সরকারের নীতিমালা লঙ্ঘন করে বেপরোয়া প্রাইভেট কোচিং নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।যদিও নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট কোচিং বেআইনী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্লাশের পূর্বে ও পরে এমনকি ক্লাশ চলাকালীন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে তারা নির্বিচারে কোচিং চালিয়ে যাচ্ছেন।

সূত্র জানায়, স্কুল প্রধান শিক্ষক-শিক্ষিকা তাদের সহকারি শিক্ষক-শিক্ষিকা নিজ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বাহিরে কোথাও প্রাইভেট কোচিং করাচ্ছেন কি না তার খোঁজ রাখার দরকারই মনে করেন না। স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট কোচিং করানোর বিষয়টি সরকারি নীতিমালায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু, অর্থলোভী এসব শিক্ষক-শিক্ষিকারা সরকারের নিয়ম-নীতিমালাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছেন। এক জন শিক্ষক স্কুলে ছাড়াও ৭-৮ টা প্রাইভেট কোচিং করান, আর এক একটি ব্যাচে ১৫-২০ জন ছাত্র-ছাত্রী। একজন শিক্ষার্থীকে প্রাইমারি লেভেলে প্রাইভেট কোচিং করাতে অভিভাবকদের প্রতি মাসে ৫ শ থেকে ২ হাজার টাকা গুণতে হয়। হাই স্কুল লেভেলে গুণতে হয় ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। কলেজ লেভেলে শাখা বেধে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা গুণতে হয়। উপজেলার মধ্যে মোট শিক্ষার্থীর ৬০-৭০ শতাংশ প্রাইভেট কোচিং করে। মূলত সরকারি ও এমপিওভুক্ত কিছু স্কুলের কতিপয় শিক্ষকের কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্যের কারণেই শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ভালো পরীক্ষা দিয়েও যাতে কাঙ্খিত নাম্বার থেকে বঞ্চিত হতে না হয় কিংবা কিছু ক্ষেত্রে শাস্তি বা অপদস্থ হওয়া থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য এসব শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে ছুটতে হয়। যার ফলশ্রুতিতে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মানুষকে এই দুর্মূল্যের বাজারে প্রাইভেট-কোচিং এর অতিরিক্ত খরচ জোটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জানা যায়, প্রতি বছর প্রাইভেটের কোচিং বাবদ এক অভিভাবকদের অতিরিক্ত ব্যয় হয় লক্ষাদিক টাকা।শিক্ষকরা প্রাইভেট কোচিং করান বলেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কোচিং করান। এসব শিক্ষকের ক্লাসে মনোযোগ নেই, তাই ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল কলেজে যায় না, আর গেলেও মনোযোগহীন। কিন্তু, ছাত্র-ছাত্রীরা প্রাইভেট কোচিং মিস করে না। কোচিং শিক্ষকও প্রাইভেট কোচিং করান অত্যন্ত যত্ন সহকারে।

অভিভাবক সূত্রে জানাযায়, স্কুলের বেতন, কোচিং এর বেতন ও বাড়িতে স্কুলের শিক্ষক দিয়ে প্রাইভেট কোচিং করানো বাবদ তিনি প্রতি মাসে ৩,৫০০ টাকা ব্যয় করতে হয়। কারণ শিক্ষকদের ক্লাসে মনোযোগ নেই। নিজ স্কুলে শিক্ষকের নিকট কোচিং না করলে রেজাল্ট খারাপ হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানিয়ে দিয়েছে অর্থলোভী এসব শিক্ষক।

প্রাইভেট কোচিং বাণিজ্যের সাথে জড়িত এক শিক্ষক জানান, সরকার যে পরিমান বেতন দেয় তাতে নাকি তার পোশায় না।প্রাইভেট কোচিং না করলে নিজের পরিবার পরিজনদের খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা চাই। তাই এই কোচিং  বাণিজ্যের সাথে জড়িয়েছে বলে জানান তিনি।

সচেতন অভিভাবকরা জানান, এটা প্রশাসনের গাফিলতি। প্রাইভেট কোচিং এর সাথে জড়িত শিক্ষকদের আজ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থাগ্রহণ করার দৃষ্টান্ত নেই। সাধারণ মানুষের দাবি কোচিং বাণিজ্যের সাথে জড়িত শিক্ষকদের খোঁজে বের করে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। তা না হলে, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়ে পড়বে সার্টিফিকেট বিক্রির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ।কোচিং ফাঁদ থেকে জেলার  শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে হবে। পরীক্ষার মাধ্যমে সত্যিকারের শিক্ষিতদের চিহ্নিত করার কৌশল খুঁজে বের করতে হবে, যাতে শিক্ষিত বেকার সৃষ্টির আশঙ্কা না থাকে।মনে রাখা দরকার, সুশিক্ষার ওপরই একটি জাতির উত্থান ও ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল।

শিক্ষা কোনো বাণিজ্যের বিষয় হতে পারে না, শিক্ষা সবার অধিকার।গোটা শিক্ষা পদ্ধতি যেখানে নম্বরের পেছনে ছুটছে, শিক্ষা প্রতিযোগিতা প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, সেখানে কোচিং বন্ধের অভিযানের সফলতা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। পরীক্ষায় উচ্চ নম্বর পেতে হবে কিন্তু ক্লাসে সে নিশ্চয়তা নেই। অভিভাবক দিশেহারা। এই সুযোগ ডেকে আনে কোচিং সেন্টারকে। নিরুপায় অভিভাবক কষ্টের উপার্জন দিয়ে সন্তানের জন্য শিক্ষা কেনেন। মেধা প্রতিভা যোগ্যতা যাচাইয়ের একমাত্র পথ নম্বর হলে যে কোন মূল্যে তা অর্জনের চেষ্টা চলবেই। আর আজকের বাজারি যুগে এরকম একটি বিষয় নিয়ে বাণিজ্য হবে তা অস্বাভাবিক নয়। কোচিং বাণিজ্য উচ্ছেদ করতে হলে তাই সমস্যার একেবারে মূলে হাত দিতে হবে।কোচিং বাণিজ্য বন্ধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় ক্লাসে মানসম্পন্ন শিক্ষা দেয়া। সে জন্য প্রয়োজন যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক।

শেয়ার করুন

একই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2021,বিবিএন নিউজ
Developer By Zorex Zira